ঢাকা ১২:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেটে ট্রিপল মার্ডার, রহস্য ঘনীভূত

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট
  • আপডেট সময় : ১১:২০:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • / 5

সিলেটে ট্রিপল মার্ডার, রহস্য ঘনীভূত

দৈনিক দেশ আমার অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকায় নিজ বাসা থেকে সাবেক কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে পুলিশ তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে তিনজনকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাসার বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ দেখতে পায়। নিহতদের গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে কেউ বাসায় প্রবেশ করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তদন্তে

নিহত আব্দুস সাত্তার রিকাবীবাজার এলাকায় পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধ ও মামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গির্জা সমিতির কাছ থেকে জায়গাটি লিজ নিয়ে তিনি সেখানে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন।

২০২৩ সালে ওই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে তিনি স্বত্ব মামলা করেন। পরে ওই মামলার জেরে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। আগামী ১৯ আগস্ট ওই মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল। শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে আব্দুস সাত্তার হত্যার শিকার হলেন।

নিহতের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, স্বত্ব মামলাটির নম্বর ২১১/২৩ এবং সিভিল রিভিশন মামলাটির নম্বর ৭০/২৩। তিনি বলেন, আব্দুস সাত্তার নিয়মিত মামলার শুনানিতে আদালতে হাজির হতেন। দুই সপ্তাহ আগেও শুনানিতে তিনি উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় সিরাজুল ইসলাম তাকে হুমকি ও দুর্ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি করেন আইনজীবী।

তবে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় পুলিশ।

তছনছ তিন ওয়ারড্রোব, নেই গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র

হত্যাকাণ্ডের পর বাসার ভেতরের বেশ কিছু জিনিস তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে। দেয়াল, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ রয়েছে। আব্দুস সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোবও খোলা ও এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়।

পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওয়ারড্রোব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি দলিলের কপিও উদ্ধার করা হয়েছে। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে। রিকাবীবাজারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধও তদন্তের আওতায় রয়েছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ কমিশনার

বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।

পুলিশ কমিশনার আরও জানান, বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ রয়েছে এবং কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চলছে।

নিহতদের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেছেন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি রিকাবীবাজারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানান।

এক বাসায় থাকতেন দম্পতি ও গৃহকর্মী

আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের চার সন্তান। তাদের দুজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুজন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা দেশে ফিরছেন বলে জানা গেছে।

নিহত দম্পতির আত্মীয় মুন্না মিয়া জানান, আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম বাসায় থাকতেন। তাদের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনাও থাকতেন। বুধবার সকাল ৯টার দিকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছিল। এরপর কোনো একসময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই বাসা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, গায়েব হওয়া কাগজপত্র, বিদ্যুৎ না থাকার সময় সিসিটিভি বন্ধ থাকা; সবকিছু সামনে রেখে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

সিলেটে ট্রিপল মার্ডার, রহস্য ঘনীভূত

আপডেট সময় : ১১:২০:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকায় নিজ বাসা থেকে সাবেক কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে পুলিশ তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে তিনজনকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাসার বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ দেখতে পায়। নিহতদের গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে কেউ বাসায় প্রবেশ করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তদন্তে

নিহত আব্দুস সাত্তার রিকাবীবাজার এলাকায় পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধ ও মামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গির্জা সমিতির কাছ থেকে জায়গাটি লিজ নিয়ে তিনি সেখানে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন।

২০২৩ সালে ওই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে তিনি স্বত্ব মামলা করেন। পরে ওই মামলার জেরে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। আগামী ১৯ আগস্ট ওই মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল। শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে আব্দুস সাত্তার হত্যার শিকার হলেন।

নিহতের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, স্বত্ব মামলাটির নম্বর ২১১/২৩ এবং সিভিল রিভিশন মামলাটির নম্বর ৭০/২৩। তিনি বলেন, আব্দুস সাত্তার নিয়মিত মামলার শুনানিতে আদালতে হাজির হতেন। দুই সপ্তাহ আগেও শুনানিতে তিনি উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় সিরাজুল ইসলাম তাকে হুমকি ও দুর্ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি করেন আইনজীবী।

তবে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় পুলিশ।

তছনছ তিন ওয়ারড্রোব, নেই গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র

হত্যাকাণ্ডের পর বাসার ভেতরের বেশ কিছু জিনিস তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে। দেয়াল, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ রয়েছে। আব্দুস সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোবও খোলা ও এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়।

পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওয়ারড্রোব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি দলিলের কপিও উদ্ধার করা হয়েছে। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে। রিকাবীবাজারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধও তদন্তের আওতায় রয়েছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ কমিশনার

বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।

পুলিশ কমিশনার আরও জানান, বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ রয়েছে এবং কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চলছে।

নিহতদের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেছেন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি রিকাবীবাজারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানান।

এক বাসায় থাকতেন দম্পতি ও গৃহকর্মী

আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের চার সন্তান। তাদের দুজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুজন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা দেশে ফিরছেন বলে জানা গেছে।

নিহত দম্পতির আত্মীয় মুন্না মিয়া জানান, আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম বাসায় থাকতেন। তাদের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনাও থাকতেন। বুধবার সকাল ৯টার দিকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছিল। এরপর কোনো একসময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই বাসা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, গায়েব হওয়া কাগজপত্র, বিদ্যুৎ না থাকার সময় সিসিটিভি বন্ধ থাকা; সবকিছু সামনে রেখে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।